স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সমুদ্র উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার চাষীরহাট ইউনিয়নটি ছিল একটি পশ্চাৎপদ, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত ইউনিয়ন। কিন্তু একজন মানুষের ছোঁয়ায় সেই ইউনিয়নটি এখন উন্নয়নের পথে বেগবান। এই উন্নয়নের রূপকার এ এলাকার কৃতিসন্তান হেবযুত তওহীদের মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি অনেক বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের মুখেও এলাকার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর উদ্যোগে এই ইউনিয়নে শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষিসহ প্রায় ৫০টির বেশি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালানোর জন্য বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয় যার নাম- চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয় ।

বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং প্রতিযোগিতামূলক। আজ একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হচ্ছে অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে জ্যামিতিক হারে। বাড়তি এই জনসংখ্যার বহুমুখী চাহিদা পূরণ করতে হলে উৎপাদন খাতে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার প্রয়োজন পড়ছে। ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিকভাবে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যা একই সাথে তাদের আত্মিক উন্নয়ন ঘটাবে ও দেশপ্রেমিক করবে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা প্রয়োজন যা একদিকে তাদের নৈতিক চরিত্রে বলিয়ান করবে, মানবতাবোধ জাগ্রত করবে, সমস্ত রকম ভেদাভেদ, বৈষম্য দূর করে সাম্য ও ঐক্যের চেতনা সৃষ্টি করবে। অপরদিকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য, জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায়ও তারা শিক্ষিত হবে। এ দুই দিকের সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটাই জীবনের সার্থকতা নয়, বড় বিষয় হচ্ছে সেই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে মায়া-মমতা, ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা, সততা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলি রয়েছে কিনা। একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষার গুণে মানুষ হিসাবে বড় হয়ে উঠল, নাকি কেবল পুঁথিগত ও বস্তুগত বিদ্যা অর্জন করে স্বার্থপর যন্ত্রমানবে পরিণত হল কিনা সেটাই আসল কথা।

কেন চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়?

দেশের অন্যান্য স্কুলের মতোই শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক প্রণিত সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুসরণ করেই এখানে পাঠদান করা হয়। একাডেমিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে বেশ কিছু বিষয় অন্যদের সঙ্গে আমাদের স্কুলের বিরাট পার্থক্য এনে দিয়েছে যা উল্লেখযোগ্য। সে আলোচনায় আসার আগে শিক্ষার্থীদের মানুষ হওয়ার বিষয়টা নিয়ে আলোকপাত করছি। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক চরিত্র ও আচরণে যে পরিবর্তন এসেছে তা সত্যিই অভাবনীয় । আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ধরনের সমস্যা দেখা যায় তা হলো: পরীক্ষায় নকল, অসদুপায় অবলম্বন করে পাশ করার চেষ্টা, স্কুলের জিনিসপত্র চুরি, স্কুলের সম্পদ বিনষ্ট করা, সহপাঠীদের বুলিং, র‍্যাগিং, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং, উত্যক্ত করার প্রবণতা ইত্যাদি। আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিগত চার বছরে স্কুলে হওয়া বিভিন্ন পরীক্ষার হলগুলোতে দেখা গিয়েছে, হলরুমে কোনো শিক্ষক না থাকলেও কোনো শিক্ষার্থী অন্যের লেখা নকল করে না বা কারোটা দেখেও লিখে না, কারো সাথে কথাও বলে না। শিক্ষক হলে না থাকলেও কেউ শ্রেণিকক্ষে হট্টগোল করে না বরং সুশৃঙ্খল থাকে। শিক্ষকদের শিখন পদ্ধতি লক্ষ রাখার জন্য যেহেতু প্রতিটি ক্লাসরুমে সিসি ক্যামেরা আছে তাই প্রধান শিক্ষক নিজ কক্ষ থেকে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ মনিটরিং করতে পারেন।

স্কুলটিতে সহশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেওয়া হয়। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক বা পদস্খলনের কোন ঘটনা ঘটে নি। ইভটিজিং, র‍্যাগিং, বুলিং বা অন্যান্য যেসব সামাজিক অপরাধগুলো সংক্রামক ব্যাধির মতো গ্রাস করেছে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে, চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয় সেখানে এই অপরাধগুলো থেকে একদমই মুক্ত। আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোন অভিযোগ নিয়ে স্কুলটিতে বিচার-শালিস হয় নি। কোনো অভিভাবক বা শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকেও এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসে নি। যেখানে বর্তমান সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের সাথেও ছাত্রীদের অনৈতিক সম্পর্কের সংবাদ গণমাধ্যমে পাওয়া যায়। সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এধরনের কোনো অনৈতিক সম্পর্কের চর্চার কোনো নজির নেই। সহশিক্ষার স্কুলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বিষয়টি আমাদের স্কুলের একটি অনন্য সফলতা বলা যায়। এখানেই শেষ নয়, স্কুলের শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে স্কুল প্রাঙ্গণেই একটি খাবারের স্টল দেওয়া হয়েছে। স্টলটি যিনি পরিচালনা করেন তিনি একইসাথে স্কুলের দপ্তরী। ফলে বিভিন্ন সময় তাকে স্কুলের কাজে স্টলের বাইরে যেতে হয়। স্টলে বিক্রয়কর্মী না থাকলেও স্টলটি সারাদিন খোলাই থাকে । কিন্তু অবিশ্বাস্য ঘটনা হচ্ছে, স্টল থেকে কখনো কোনো খাবার, চকলেট, বিস্কুট, কলম, পেনসিলসহ কোনো চুরির ঘটনা কখনো ঘটে নি । যা সত্যিই অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়কে আলাদা করেছে। স্কুলের মাঠের চারপাশে অনেকগুলো আমগাছ রয়েছে যেগুলোতে মৌসুম এলে প্রচুর আম ধরে। গাছগুলো ছোট হওয়ায় আমগুলো সব হাতের নাগালেই থাকে কিন্তু স্কুলের কোনো বাচ্চা একটি আমেও হাত দেয় না। কারণ তাদের নৈতিকতাবোধ এতটাই উন্নত যে তারা অনুমতি ছাড়া কখনও অন্যের কোনো কিছু নিতে শিখেনি।

এবার একাডেমিক দিক সম্পর্কে কিছু কথা। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণ শিক্ষকমণ্ডলী শিক্ষকতা করছেন। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনোদন, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সফর, কারিগরি শিক্ষা প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বের উপযোগী নাগরিকে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বিষয় সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেওয়ার জন্য ক্লাসরুমে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নিশ্চিত করতে স্কুল শেষে ‘ডিটেনশন ক্লাস' নামে এক্সট্রা ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যে ছাত্ররা ক্লাসে পড়া বুঝে না বা পড়া দিতে পারে না তাদেরকে শিক্ষকরা এই এক্সট্রা ক্লাসের মাধ্যমে পুনরায় পড়া বুঝিয়ে দেন। নিয়মিত ক্লাস, নিয়মিত পরীক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত মডেল টেস্টও নেওয়া হয় এবং ফলাফলের ভিত্তিতে ছাত্রদেরকে পুরস্কৃত করা হয়। অভিভাবকদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ছাত্রদেরকে জীবনের কী লক্ষ্য শেখানো হয়?

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে শিক্ষাজীবন। শিক্ষাজীবনের উপরই নির্ভর করে মানুষের বাকিজীবনের পথচলা। একজন ছাত্র বড় হয়ে কী করবে, কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে সেটা নির্ধারিত হয় শিক্ষাজীবনে । কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধীনেই একজন শিক্ষার্থী ছোট থেকে ধীরে ধীরে যৌবনে উপনীত হয়। এই বয়সে সে তার পরিবার থেকে, স্কুল থেকে, বড়দের থেকে যা শিখে সেটাই তার বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলে। এ সময়েই তার পরবর্তী জীবনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই আমাদের স্কুলে কোন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পর আমরা তাকে মানুষ হিসাবে তার জীবনের সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বেছে নিতে সহায়তা করি । আমাদের সমাজে সাধারণত ছোটবেলা থেকে একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয়, বড় হয়ে সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বড় চাকুরে হবে। কিন্তু সে দেশপ্রেমিক হবে, মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, নিজের জীবনকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিবে এ ধরনের শিক্ষা তাকে দেওয়া হয় না। এমনকি শিক্ষকদেরও এখন আর এমন কথা বলতে শোনা যায় না। তারাও কীভাবে একটা ভালো চাকরি পাওয়া যাবে সেসব নিয়েই শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিয়ে থাকেন। আমাদের কথা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, অধ্যাপক হবে সবই ঠিক আছে কিন্তু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সে মূলত মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, দেশ ও জাতির জন্য শ্রম দিবে। সে স্বার্থপর হবে না। এই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েই তাকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে । আজকে আমাদের সমাজে যারা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার আছেন তারা তাদের পেশাকে তারা স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে পরিণত করেছেন। দেশের ও মানুষের ক্ষতি করেও তারা টাকার কুমির হতে চাচ্ছেন। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এটাই বলছি যে, তারা বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ সবই হবে কিন্তু এই সবকিছুই যেন দেশের কল্যাণে হয়। তারা যেন সদা-সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকে । যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। মাতাপিতা, শিক্ষক ও গুরুজনদের ভক্তি করে এবং তাদের নির্দেশ ও উপদেশ অনুসারে নিজেদের গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকে। তারা যেন নিজেদের জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা, সামর্থ্যকে নিঃস্বার্থভাবে জাতির কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারে। তারা যেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অর্থবহ কাজে ব্যয় করে। কোনোরূপ অসার কাজ, নিজ বা অপরের জন্য ক্ষতিকর এমন কাজে সম্পৃক্ত না হয় । প্রকৃতপক্ষে আমরা শিক্ষার্থিদের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি সুনাগরিক একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ার জন্য।

শিক্ষা সম্মেলনের উদ্যোগ

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ আমাদের স্কুল প্রাঙ্গণে একটি শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে পড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা, সৃজনশীলতা, জ্ঞান ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে আমরা এই সম্মেলনের আয়োজন করি । অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অজিত দেব । বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার কানিজ ফাতেমা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. নাজিম উদ্দিনসহ উপজেলার স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষকমন্ডলী, অভিভাবকসহ শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ। আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কিছু নাটিকা ও ভূমিকাভিনয়ের মাধ্যমে শিক্ষামূলক নানা বিষয় তুলে ধরে। বক্তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ে তোলার ব্যাপারে নানা দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।

ছবি: বাম থেকে তৃতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, টি.এন,ও, অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক শিক্ষা, উপজেলা শিক্ষা অফিসার প্রমুখ ।

ছাত্রদের আবাসিক ব্যবস্থা, পড়াশুনা ও শৃঙ্খলা

ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও থাকা-খাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করতে স্কুলটির রয়েছে নিজস্ব আবাসিক সুবিধা যেখানে বর্তমানে শতাধিক ছাত্র ও বিশ জনের অধিক ছাত্রীর আলাদা আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এখানে সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বর্তমানে শতাধিক শিক্ষার্থীর আবাসন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়কসহ ৭ জন দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের পড়াশুনার দিকে খেয়াল রাখার জন্য শিক্ষক রয়েছেন, যারা সন্ধ্যার পর তাদেরকে পড়তে বসান। ক্লাসের দুবর্ল শিক্ষার্থীদের জন্য এই নৈশকালীন বিদ্যালয়ে বিশেষ যত্ন দেওয়া হয় যেন সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয়ের ফলাফল ভালো হয় । এভাবে ছাত্রাবাসটিও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছে যার নাম রাখা হয়েছে ‘সেলিম'স টিউটোরিয়াল একাডেমি'। এখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদেরকেও শিক্ষাদান করা হয় । পাঠ্যক্রমের শিক্ষার বাইরে ছাত্রদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করার জন্য মসজিদভিত্তিক কিছু শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদে তারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ কায়েম করে এবং মক্তবে আরবি ভাষা শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে। সেখানে তাদেরকে কোর'আন পাঠের পাশাপাশি বঙ্গানুবাদ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক শৃঙ্খলাগুলো ক্লাসরুমে টাঙানো থাকে। প্রতি সপ্তাহে একবার সেগুলোর উপর আলোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো তাদেরকে কঠোরভাবে মেনে চলার শিক্ষা দেওয়া হয় । শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শিক্ষামূলক শাস্তিও দেওয়া হয়। যেমন: বাড়তি পড়া দেওয়া বা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করা ইত্যাদি। এভাবে তারা শৃঙ্খলা মানার ব্যাপারে আগ্রহী হয়।

শিক্ষার্থিদের জীবনমুখী শিক্ষা

এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের প্রায়োগিক জ্ঞানও প্রদান করা হয়। যেমন ছাত্রাবাসের উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের দায়িত্ব থাকে নিচের ক্লাসের ছাত্রদের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া। এতে চক্রাকারে সব ছাত্রদের মধ্যেই শিক্ষাদানের দক্ষতা গড়ে ওঠে, শিক্ষার চর্চাও অব্যাহত থাকে। একই সাথে তাদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা, কর্মমুখী চিন্তা ও নেতৃত্বের গুণাবলী গড়ে ওঠে। এই বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই কোনো কোচিং সেন্টারে পড়ে না। তারা একটি শিক্ষাচক্র বা স্টাডি সার্কেল মেনে পড়াশুনা করে। তাছাড়া চাষিরহাট উন্নয়ন পরিষদের অধীনে অর্ধশতাধিক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে, যেমন: গরুর খামার, মাছের খামার, পোলট্রি ফার্ম, হাঁসের খামার, ধান চাষ প্রকল্প, বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ প্রকল্প, গার্মেন্টস, ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা, কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কোম্পানি, খাবার হোটেল ইত্যাদি। কর্মমুখী বাস্তব জ্ঞান নেওয়ার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদেরকে ভিজিট করানো হয় এবং ছুটির দিনে আগ্রহীদের কাজের দক্ষতাও অর্জন করানো হয়। নিজস্ব কম্পিউটার ল্যাবে শিক্ষার্থীদেরকে কম্পিউটার ব্যবহার করে নানা প্রয়োজনীয় কাজ করার দক্ষতা প্রদান করা হয়। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞানের মাধ্যমে তাদেরকে জীবনমুখী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

শিক্ষার্থিদের প্রতিষ্ঠিত ক্লাব বা সংগঠন

শিক্ষার্থিদের মধ্যে নানামুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে স্কুলের উদ্যোগে বিভিন্নরকম ক্লাব চালু করা হয়েছে যেমন: ভাষাশিক্ষা ক্লাব (ইংরেজি ও বাংলা), নৈতিক শিক্ষা ক্লাব (ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, ইসলামের সঠিক আকিদা শিক্ষা), সাংস্কৃতিক শিক্ষা ক্লাব (আবৃত্তি, সঙ্গীত, অভিনয়, নৃত্য ইত্যাদি), ডিবেটিং ক্লাব, বক্তব্য ও সাহিত্য শিক্ষা ক্লাব, ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব । এগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে, বৃদ্ধি করা হচ্ছে তাদের সামাজিক দক্ষতা। এসবের সঙ্গে যারা যুক্ত হচ্ছে তারা ডিজিটাল ডিভাইস আসক্তি ও অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে সৃজনশীল সুস্থ আনন্দ বিনোদন লাভ করছে। তারা একক অভিনয়, আবৃত্তি, নাটক, গান ইত্যাদির মাধ্যমে দেশপ্রেম ও মানবতাবোধের ধারণাগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপন করছে। নিজেরা গান, নাটক লিখে সেগুলো চর্চা করছে, উপস্থাপনা করছে, অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ তাদেরকে সহযোগিতা করছেন। প্রতিটা ক্লাবের ক্লাস থাকে সপ্তাহে একদিন। যে বিষয়ে যাদের আগ্রহ সে বিষয়ে তাকে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়। বিজ্ঞানে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল কাজ করার সুযোগ পায় । স্কুলের সামনেই রয়েছে খেলার মাঠ। সেখানে ফুটবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি নানা খেলার আয়োজন বছরজুড়েই থাকে। এছাড়া জাতীয় দিবস উপলক্ষে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এছাড়াও শিক্ষার্থীদেরকে নিজস্ব পুকুর ও দিঘিতে সাঁতারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ক্লাবগুলো দেখুন...

ছাত্রদের কৃতিত্ব

চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে পুরো জেলায় রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছে। স্বনামধন্য পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের কৃতিত্বে বিস্মিত। পঞ্চম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজন শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করেছে (বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারি বৃত্তি পরীক্ষা একবারই অনুষ্ঠিত হয়েছে, এখন সরকারি বৃত্তি পরীক্ষা সরকার বন্ধ করে দিয়েছে)। এসএসসি-তে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশের হার শতভাগ ।

  • ২০২২, ২০২৩ সনের বিজয় দিবস এবং ২০২৪ সনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা উপজেলা পর্যায়ের কুচকাওয়াজে অংশ নেয় এবং তিন বারই প্রথম স্থান অধিকার করে।
  • ২০২২ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে সোনাইমুড়ি উপজেলা পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা ডিসপ্লে প্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেই প্রথম স্থান অর্জন করে। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও ডিসপ্লে প্রদর্শনীতে প্রথম স্থান অধিকার করে।
  • ২০২২ সালে সোনাইমুড়ী উপজেলা পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত আন্তঃবিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বালক ও বালিকা কাবাডির উভয়টিতেই প্রথম স্থান অধিকার করে।
  • ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২৪' এ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের ইভেন্টগুলোতে তারা অংশ নেয় এবং সংগীত, লোকনৃত্য, রচনা (ইংরেজি), রচনা (বাংলা), অভিনয়সহ মোট এগারোটা ইভেন্টে তারা বিজয়ী হয়। চারটা ইভেন্টে প্রথম স্থান অধিকার করায় তারা জেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
  • ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২৪' উপলক্ষে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে এই বিদ্যালয় থেকে ৪ জন অংশগ্রহণ করে ২টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়।
  • ২০২৪ এর ২৪ জানুয়ারি দেশজুড়ে ৪৫ তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উদযাপন করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। তারা একটি ‘স্মার্ট ভিলেজের প্রজেক্ট' উপস্থাপন করে উপজেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। এভাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে সাফল্যের সাথে এগিয়ে চলেছে যা নিঃসন্দেহে চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় অর্জন।

নৈশকালীন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র

গ্রামের বয়স্ক নিরক্ষর মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে নৈশকালীন বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিবিড় তত্তাবধানে পরিচালিত হয় এই শিক্ষা কার্যক্রম। এখানে নানা পেশার সাথে জড়িত বয়স্ক নিরক্ষর লোকেরা অক্ষরজ্ঞান (বাংলা, ইংরেজি, আরবি পড়া ও লেখা), বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় গণিত, সাধারণ জ্ঞান, জীবনঘনিষ্ঠ বিজ্ঞানের কিছু সূত্র ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবিষ্যত পরিকল্পনায় রয়েছে একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ, দুইটি আবাসিক ভবন নির্মাণ ও খেলাধুলার মাঠ বর্ধিতকরণ। এছাড়াও বিদ্যালয়ে কলেজ সেকশন চালু করা, কারিগরি সেকশন চালু করা ও বিভিন্ন কর্মমুখী শর্ট কোর্সের মাধ্যমে গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার ব্যবস্থা করা। এছাড়াও একটা নতুন শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নৈতিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা ও দেশ প্রেমের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারবে।